রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২১

 

শুভ্রর ভেদতত্ত্ব

 

“গাহি সাম্যের গান…। সংগচ্ছদ্ধ্বম সংবদাদ্ধ্বম সংবোমানমসি জানতম ...।“- সাম্যই গতি (পরিণতি)। আমরা সবাই এগিয়ে চলেছি সাম্যের দিকে। যেখানে অসাম্য সেখানেই পীড়ন – টেনশন। আমরা সকলেই চাই সাম্য – সমান হতে। কারণ সাম্যই যে গতি। কিন্তু আমরা জানি যে ভেদ না থাকলে চাকা ঘোরে না। উচ্চতার পার্থক্য না থাকলে জলের প্রবাহ হয় না। চাপের পার্থক্য না থাকলে বায়ু প্রবাহ হয় না। শূন্যস্থান না থাকলে পূরণের আর্তি জন্মায় না। কারখানায় উৎপাদন হয় না।  সভ্যতার চাকা সচল রয়েছে এই ভেদের উপরে। তাহলে সংসার তথা সভ্যতার প্রয়োজনে ভেদ প্রয়োজন। কিন্তু সাম্যই যে গতি ...। তাই কি ধরণের সাম্য আমরা চাই তা আমাদের ভাবার প্রয়োজন। আমরা এমন সাম্য চাই যেখানে ভেদ থাকবে কিন্তু সেই ভেদ মানুষকে বেদনা দেবে না। মানুষ প্রসন্ন চিত্তে এই ভেদকে সন্মান করবে।

কারণ ছাড়া কার্য হয় না। কর্মের মূলে কারণ। পদার্থ বিজ্ঞানে এই সত্য আমরা বারবার উপলব্ধি করেছি। কিন্তু পদার্থ তো স্থূল জগতের অংশ। পদার্থ বিজ্ঞানে আমরা দেখেছি কারণ যত স্থূল কর্মও তত স্থূল। যেমনঃ স্বল্প বল প্রয়োগে বস্তুর স্বল্প আন্দোলন; অধিক বল প্রয়োগে বস্তুর অধিক আন্দোলন। কারণকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করলে যে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কর্মের উৎপত্তি ঘটে তা আমাদের দৃষ্টি গোচর নাও হতে পারে। আর সকলের দৃষ্টি তথা উপলব্ধি তো সমান নয়। তাই কারণ স্বরূপ সমস্ত ঘটনা সকলকে সমান ভাবে নাড়া দেয় না। আবার ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে নাড়া দেয়। জগতের কোনো ঘটনাই অলৌকিক নয়। শুধু বস্তুর জগতকে ব্যতি রেখে অধ্যাত্ম জগতের ঘটনাবলীকেও অলৌকিক বলা চলে না। অলৌকিক বলতে, যা লোকের বোধগম্য নয়। কোনো ব্যক্তির বিদ্যুতের সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকলে বিদ্যুৎ তথা আলো বা কোনো বৈদ্যুতিন যন্ত্রের ক্রিয়াকে অলৌকিক বলে মনে হবে। আর কার্য কারণ সম্পর্কের মূলে আছে ভেদ। কার্য-কারণ সম্পর্ক সূক্ষ্ম হলে ভেদও সূক্ষ্ম। বিভিন্ন কারণের একতা বা সমন্বয় থাকলে তা কোনো বড় কার্যের কারণ হতে পারে। স্থূল জগতে বিভিন্ন সত্ত্বার মধ্যে একটা তাই অতি আবশ্যক। তাই একতাই বল। তা সমাজের প্রয়োজনে – রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। তাই ভেদ যেমন প্রয়োজন একতাও তেমন প্রয়োজন। কিন্তু তুমি আমি ভেদ যুক্ত হয়েও এক হই কিভাবে।

তুমি মানুষ আমিও মানুষ। তোমার রক্ত লাল - আমার রক্তও লাল। তুমি আমি এক ভাষাতেই কথা বলি। তাই আমরা সমান – এক। কিন্তু তোমার দৃষ্টি আমার দৃষ্টি এক হলেও একটা ফুলকে তুমি একরকম ভাবে দেখো আমি দেখি আরেক রকম ভাবে। তাই ফুলটির মূল্য তোমার কাছে এক রকম আমার কাছে আরেক রকম।

একটি সহমতে আমাদের আসতেই হবে – ভেদ আমাদের প্রয়োজন। ভেদ ছাড়া সংসার অচল। কিন্তু সাম্যই গতি – শান্তি।

আজ আমাদের দেশ নানা ভেদে বিভক্ত – উচ্চ-নীচ, বড়-ছোট, তোমার অধিকার-আমার অধিকার। এই ভেদকে কেন্দ্র করেই আমরা হারিয়েছি আমাদের দেশের তথা আমাদের জন্মভূমির একটা বড় অংশ। বলাবাহুল্য পাকিস্তান-বাংলাদেশের উৎপত্তির কারণ এই ভেদ।  

সুতরাং আমরা দেখছি, যে ভেদ সংসারের চালিকা শক্তি সেই আবার কখনও ধ্বংসাত্মক রূপে সংসারের ক্ষতি সাধনে উদ্ধত।  তাই ভেদতত্ত্ব সঠিক প্রয়োগ আমাদের বাঞ্ছনিয়। এই প্রয়োগ হওয়া উচিৎ বিজ্ঞান ভিত্তিক। পদার্থ বিজ্ঞানে তথা বস্তু বিজ্ঞানের স্থূল কার্য -কারণ সম্পর্ককে ছাড়িয়ে আধ্যাত্ম জগতের সূক্ষ্ম কার্য কারণ সম্পর্ককের সাপেক্ষে আমাদের ভেদতত্বকে বাস্তুবায়িত করা প্রয়োজন। আধ্যাত্ম জগতের কথা এখানে বলার কারণ – এই ব্রহ্মাণ্ডের যত সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর কার্য-কারণ সম্বন্ধাবলী তা এই অধ্যাত্ম বিজ্ঞানেরই অন্তর্গত। এই জগতে সব কিছু সম্ভব – কোনো কিছুই অসম্ভব নয় – যদি সেই কারণ সলীলের কারণ অন্বেষণ করতে পার। কিন্তু আমরা চাই এক সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা যা স্থায়ী; মানুষের মূল্যবোধ, সঠিক ভেদ জ্ঞান তথা বিচার জ্ঞানের বিকাশ।

বৈদিক যুগের প্রাক্কালে “সেই এক সাথে চলব, এক কথা বলব, একই চিন্তা করব…” সুরের মাঝখান থেকে সামাজিক আমূল সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে চতুর্বণের সৃষ্টি এমনই এক ভেদ তত্ত্বের প্রয়োগ। আমাদের সংহিতা এই ভেদ তত্ত্বের প্রয়োগ করেছেন এই চতুর্বর্ণের মধ্যে। হ্যা, ব্রাহ্মণ জ্ঞানার্জন এবং সমাজে জ্ঞানের আলো বিতরণে ব্রতী থাকবেন; তাঁর এই কাজে সুরক্ষা প্রদান করবেন ক্ষত্রীয়; বৈশ্য নেবেন তাদের ভরণ পোষণের দায়ীত্ব; শূদ্র্ দেবেন সেবা; আর সেবা কখনোই ছোটো কাজ নয়। ছোটো সেই, যে বা যারা সেবার মহত্বকে কলঙ্কিত করেছেন।

আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ – অধিক রূপে বলা চলে অপরা বিদ্যার যুগ। এই যুগে মানুষের চাহিদা ও আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে অপরা বিদ্যা নানা রূপে অবতীর্ণ। যে ভেদ সভ্যতার গতিকে স্থিতিশীল, সুশৃংখলিত করে রেখেছিল তা অপরা বিদ্যার বিকাশে উদ্বায়ীত। আমাদের মনে রাখতে হবে বৈদিক যুগে, যে ভেদ সভ্যতাকে স্থিতিশীল ও গতিশীল করেছিল তার ভিত্তি ছিল পরা বিদ্যা; আর পরা বিদ্যার কারণেই অপরা বিদ্যার বিকাশ। বর্তমানে অপরা বিদ্যার বিকাশে চতুর্বর্ণের ভেদ লুপ্তপ্রায় হবার ফলে সভ্যতার ধ্বংসাত্মক দিক গুলি প্রকট। আজ চতুর্বর্ণের ভেদ আমরা মানি না। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি জ্ঞান সাধনাকে নিজের জীবনের ব্রত করেন তিনি কি ব্রাহ্মণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন না! এটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে – সব কাজ সকলের জন্য উপযুক্ত নয়। যিনি জ্ঞান সাধনায নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি কখনোই জ্ঞানের বাণিজ্য করতে পারবেন না। বাণিজ্যে মন দিলে তিনি তার সাধনা থেকে চ্যূত হবেন। আবার যিনি ব্যবসায় পারদর্শী তার দ্বারা সাধনা চলবে না। ক্ষত্রীয় দেন সুরক্ষা। তবে আজ অপরা বিদ্যার যুগে ক্ষত্রীয়ের রাজ গুণ সুরক্ষা প্রদানের পরিবর্তে মানুষের ভীতি ও শোষণের কারণ। শক্তির আস্ফালন রূপেই তার প্রকাশ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে নানা ক্ষেত্রে যে পরিষেবা আমরা পাই – অ্যাকোয়া গার্ডের সার্ভিসিং থেকে শুরু করে বিমান সেবিকা, মাল্টিন্যাসনাল কোম্পানীর সেক্রেটারি থেকে কোনো সাইন্টিফিক প্রোজেক্টের সার্ভিস ইঙ্গিনীয়ার – তা তো শূদ্রেরই কাজ।

একথা স্পষ্ট – চতুর্বর্ণের ভেদ আমরা যেমন চাই না তেমনই সমাজে চতুর্বর্ণের তথা চার প্রকার নির্দিষ্ট গুণের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করতে পারি না। এই চতুর্বর্ণের ভেদ আমরা যে চাই না তা একান্ত রূপেই অপরা বিদ্যার বিকাশের অবশ্যম্ভাবী ফল। চতুর্বর্ণের ভেদ লুপ্তপ্রায় হবার সাথে সাথে সমাজের নানা ব্যধি তথা মূল্যবোধের হানি – বর্ণ সংকর – দ্বেষ প্রভৃতি প্রকাশমান। সমাজ যখন ব্যধিগ্রস্ত, আর অপরা বিদ্যাই যখন এর কারণ তখন অপরা বিদ্যার বিকাশকে সঠিক দিশায় পরিচালনা করা একান্তরূপেই কাম্য। অপরা বিদ্যা তথা আধুনিক বিজ্ঞান চর্চাকে আমরা সঠিক দিশায় পরিচালনা করব। যা মানুষের মূল্যবোধের হানির কারণ হবে না। বিজ্ঞান দিয়ে যেমন যা খুশি তাই করা যায় তেমনই ভ্রষ্টাচার স্তব্ধও করা যায়। ভ্রষ্টাচার স্তব্ধ হলে সবাই সবার জায়গাটা উপলব্ধি করবেন।ব্রাহ্মণ যেমন আধিপত্য লাভের জন্য বা আধিক সম্পদ আহরণের জন্য ক্ষত্রীয় বা বৈশ্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না শূদ্র যখন দেখবেন জ্ঞান সাধনায় ব্রতী ব্রাহ্মণের সম্পদের অধিকার শুধু অপরের দানেই সীমাবদ্ধ – ভিক্ষা অন্নে যিনি দিন নির্বাহ করেন – তখন তিনি অবশ্যই ব্রাহ্মণ হতে চাইবেন না।

 

অবশেষে তাঁর কথা স্মরণ করি যিনি সকলের চাহিদা তথা আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে নিজেকে সদা ব্যস্ত রাখেন – অজ্ঞানীকে জ্ঞান প্রদান করেন; শক্তিহীনকে শক্তি দেন; ধনহীনকে সম্পদের পথ বলে দেন – কিন্তু তিনি নিজে সর্বত্যাগী; বিস্ময়! তাঁর দান পাত্র কখনও শূন্য থাকে না।     

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

 

অবতার তত্ত্ব

ঈশ্বর অবতার রূপে এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন বিভিন্ন সময়ে। এই কথা ব্যক্ত হয়েছে নানা ধর্ম গ্রন্থে। শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন এই রকম অবতার। আবার যিশুখ্রিস্টকেও ঈশ্বরের অবতার তথা ঈশ্বর পুত্র বলা হয়। এই অবতার এবং নানা দেবদেবীর বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের ধারনা অস্পষ্ট। নানা সময়ে আমরা নানা দেবদেবীর পূজার্চনা করি আবার একই সাথে শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামকৃষ্ণ এঁদের পূজাও করে থাকি। একটা কথা আমাদের স্মরণে রাখতে হবে - পূজা আমরা যেকোন সত্তাকেই করতে পারি। পূজার মাধ্যমে কোন সত্তাকে তুষ্ট করতে পারলে আশানুরূপ ফল লাভ করা যায়। আমর আমাদের লৌকিক জগতে যেমনটি দেখি ঠিক তেমনটিই। কোন প্রভবশালী ব্যক্তির সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আমরা যেমন তাঁর কৃপাধন্য হই; তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত কৃপা (সুযোগ বা সুবিধা) লাভ করি ঠিক তেমনই ভাবে কোন দেবদেবীকে তুষ্ট করে আমরা অনুরূপ ফল লাভ করি। এখন, পরম জ্ঞান লাভ করতে গেলে, পরমেশ্বরের সাক্ষাত লাভ করতে গেলে যেমন ভক্তি যোগের প্রয়োজন তেমন জ্ঞান যোগ তথা বিচার পথেও তাঁকে লভ করা যায়। তবে যে পথই আমরা গ্রহণ করি না কেন তাঁর কৃপা ছারা তাঁকে লাভ করা অসাধ্য। যে পথই গ্রহণ করা হোক না কেন সাধক যদি আন্তরিক হন তবে ভগবান নিজেই তাঁকে পথ দেখিয়ে দেন।

অবতার এবং দেবদেবীর পার্থক্য করতে গেলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে অবতার হলেন একজন ব্যক্তি যিনি এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন। মৃত্যুও তাঁর হবে এই জগতিক নিয়মেই। কিন্তু দেবত্ব হল নির্দিষ্ট কতক গুলি গুণ যা প্রকাশ পায় নানা ব্যক্তি তথা মানুষের মধ্যে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেবতা বলতে কোন সূক্ষ্ম শরীর ধারীকেই কল্পনা করা হয়েছে। আমাদের এই শরীর হল স্থূল। একে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, আঘাত করা যায়। সূক্ষ্ম শরীরকে কিন্তু ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না বা আঘাত করা যায় না। এই সূক্ষ্ম ও স্থূল শরীর বলতে আমরা কি বুঝবো। আমাদের এই শরীর হল স্থূল। এ আমাদের বোধগম্য। কিন্তু সূক্ষ্ম শরীর - তা কি? একথা প্রমাণিত - চৈতন্য সর্বব্যাপী। আর শক্তি প্রবাহের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। চৈতন্য রূপী যে বিশ্বব্যাপী কম্পন - নানা প্রকার সংস্কারের আবহে সে কম্পনের যে বদ্ধ প্রকাশ, তাই হল জীবাত্মা। কোন সূক্ষ্ম দেহ বলতে আমরা এইরূপ বদ্ধ চৈতন্য রূপ কম্পন রাশিকেই বুঝব। এই বদ্ধ চৈতন্য উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই নিজেকে প্রকাশ করেন। তাই দেব দেবীরা কেউ মুক্ত নন। যাইহোক দেবদেবীরা তুষ্ট হলে তাঁরা তাঁদের ক্ষমতা অনুযায়ী অভীষ্ট ফল প্রদান করেন।

অপর পক্ষে অবতার কে? এখানে বলা প্রয়োজন পরম সত্য স্বরূপ পরমেশ্বর কিন্তু দেবদেবীদের মতো বদ্ধ চৈতন্য নন। তিনি মুক্ত, এক এবং অদ্বিতীয়। অদ্বৈত তত্ত্বে পরমাত্মা পরম চৈতন্য স্বরূপ হয়ে সর্বভূতে বিরাজমান। সর্বভূতে তিনিই - হাতিও নারায়ণ, মাহুতও নারায়ণ। তবে আমাদের হাতি নারায়ণের চেয়ে মাহুত নারায়ণের কথাই বেশি শোনা উচিৎ। উভয়েই নারায়ণ, কিন্তু হাতিতে তাঁর প্রকাশ কম, মাহুতে তাঁর প্রকাশ বেশী। এখানে, একটা কথা - এই 'প্রকাশ'। বিভিন্ন বস্তুতে তিনি বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত। অবতারে তিনি পূর্ণতর মাত্রায় প্রকাশিত, কোথাও কোথাও তিনি পূর্ণতম মাত্রায় প্রকাশিত। সাধারণ ভাবে আমরা দেখতে পাই কোন মানুষের বেশি ক্ষমতা ও দক্ষতা, কোন মানুষের কম। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তিতে তিনি বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত। অবতারে তিনি অধিক পূর্ণরূপে প্রকাশিত। সব মানুষ সমান নয়। কিন্তু বীজে সবই এক। শুধু মানুষ নয় - বিভিন্ন প্রাণী, সূর্য-চন্দ্র সবই একই পরমেশ্বরের বিভিন্ন প্রকাশ।

শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয় ভগবান বিষ্ণুর অবতার; শঙ্করাচার্যকে বলা হত নাকি তিনি শিবের অবতার। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই ত্রিদেব হলেন পরমাত্মার সত্যরজস্তম রূপ সাম্যের তিন প্রকাশ। দেব বলা হলেও অন্যান্য দেব দেবী অপেক্ষা তাঁরা অধিক মুক্ত এবং অনেকাংশে বলা চলে তাঁরা হলেন মুক্ত চৈতন্য। সৃষ্টির প্রয়োজনে সেই মুক্ত চৈতন্য নিজেকে প্রকাশ করেছেন ত্রিগুণাত্মক রূপ ভেদে। এখানে বিষ্ণু চৈতন্য সর্বাধিক প্রকাশিত হয়েছে শ্রীরামচন্দ্রে, শ্রীকৃষ্ণে। ঠিক তেমনই ভাবে শিব চৈতন্য পূর্ণতর রূপে প্রকাশিত হয়েছে শঙ্করাচার্যে।

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

দ্বৈত অদ্বৈত

দ্বৈত অর্থাৎ 'দুটি'। যারা একের অধিক সত্তায় বিশ্বাসী তাঁদের দ্বৈতবাদী বলা হয়। আমরা নানা দেব দেবীর পূজার্চনা করে থাকি। দেব দেবীকে তুষ্ট করে নিজেদের অভীষ্ট ফল প্রার্থনা করে থাকি। আবার যারা একেশ্বরবাদী তাঁরাও তাঁদের আরাধ্য দেবতার তথা ঈশ্বরের সাধন ভজন করেন। এ সবই হল দ্বৈত ভাবাত্মক। আমরা যে জড় জগতে বিচরণ করি যে জড় জগতে আমি তুমি বসবাস করি, তোমার সঙ্গে আমার মেলামেশা সবই দ্বৈত ভাবাত্মক। কারণ তুমি-আমি এক নই। এই জড় বিশ্বের সমস্ত বস্তুই দ্বৈত ভাবাত্মক - তোমার খাওয়া হলে আমার পেট ভরে না। তাহলে তুমি-আমি এক হই কি করে। বিজ্ঞান বলছে, যে জড় জগৎ আমরা দেখি তা প্রকৃত রূপে একই নির্গুণ সত্তা জাত। আমার সামনে যে বইটি রয়েছে, আমার হাতে যে ঘড়িটি রয়েছে - সবই সেই অসংখ্য অনু-পরমানুর নানা প্রকার সুবিন্যস্ত সমাহারের প্রকাশ। সেই অনু-পরমানু যার নির্মাণ কণা হল সেই ইলেক্ট্রন-প্রোটন-নিউট্রন। এই ইলেক্ট্রন-প্রোটন-নিউট্রন হল আবার একই মৌলিক কণা কোয়ার্ক জাত। তাই এ জগতের প্রতিটি জড় বস্তুই একই মৌলিক সত্তা হতে জাত। সুতরাং জর জগতের ক্ষেত্রে এই সুন্দর সৃষ্টি  শোভার নানারূপ দ্বৈত সত্তা অজ্ঞানতা পূর্ণ। কিন্তু জীব জগৎ!  আমি-তুমি - এই প্রাণী বা উদ্ভিদ জগতের দ্বৈততা? দ্বৈত না অদ্বৈত  - কোন সত্তা সঠিক এই নিয়ে বিচার বহু দিনের। তুমি আমি পৃথক ঠিকই। কিন্তু যখন দেখি তোমার খুশিতে আমার খুশি, তোমার দুঃখে আমার দুঃখ, তোমার আবেগ আমাকেও স্পর্শ করে তখন তুমি আমি এক হয়ে যাই। তখন কোথায় দ্বৈততা। হ্যাঁ, বিভেদ আছে। তোমার সঙ্গে আমার মেলে না অনেক সময়েই। তোমার-আমার নিত্য বিরোধ। কিন্তু যখন অজ্ঞানতা দূর হয়; তোমাকে আরও আরও বেশী জানি, তখন সেই মিল। হ্যাঁ, মিল খুঁজে পাই, একত্ব অনুভব করি - ঠিক। কিন্তু এক সত্তা, তা কিকরে হয়। ভারতীয় দর্শণ বলছেন, প্রাণ যার আছে তিনি প্রাণী। শরীরে যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ শরীর সচল। এই প্রাণ শরীর ত্যাগ করলেই এই শরীর জড়। অর্থাৎ প্রাণ শরীরের সাথে যুক্ত থেকে শরীরকে পরিচালনা করছে। যদিও বিজ্ঞানীর ভাষায় শরীরের নানা বিক্রিয়ার ফলেই নাকি শরীরে প্রাণের উদ্ভব (যার কোন প্রমাণ বিজ্ঞানী এখনো দিতে পারেন নি)। অদ্বৈতবাদী এইখানেই বিজ্ঞানীর যুক্তিকে খণ্ডন করেন। শরীরের নানা বিক্রিয়ায় যদি প্রাণের সৃষ্টি হত তাহলে কোন বিজ্ঞানী কেন এখনো কোন নতুন প্রাণী সৃষ্টি করতে পারলেন না। শরীরের নানা বিক্রিয়ায়ই যদি প্রাণের সৃষ্টি হয় তাহলে কেন তোমাকে আমি অনুভব করি। কেন এই একত্ব। শারীরিক বিক্রিয়ায় প্রাণের তত্ত্ব এগুলির কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে না। অদ্বৈতবাদী বলেন এই প্রাণ অনত্ব এবং বিশ্বব্যাপী। সেই বিশ্বব্যাপী অনন্ত প্রাণের এক এক অপূর্ণ প্রকাশ হলাম আমরা - এই জীব জগৎ - মানুষ-পাহাড়-পশু-পাখি-চন্দ্র-সূর্য প্রভৃতি। এই মহাপ্রাণ তথা পরমাত্মাই নিজেকে প্রকাশ করেছেন এ সৃষ্টির প্রতিটি বিন্দুতে।
হ্যাঁ, এই প্রাণ জীবদেহ ত্যাগ করলেই জীব প্রাণহীন - জড়। একই প্রাণ চালিকা শক্তিরূপে প্রতিটি জীবকে সচল রেখেছে। বিভিন্ন জীবে তাঁর প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন। সুতরাং আমরা পেলাম এক প্রাণ এবং এক জড়। আর  বিজ্ঞান তো যেকোন জড়ের একই নির্গুণ সত্তার কথা আগেই স্বীকার করে নিয়েছে।
তাহলে এই প্রাণ ও জড় – এই দুই সত্তা আমাদের এই জীব জগৎ ও জড় জগৎ সৃষ্টির জন্য দায়ী। কিন্তু এই জড় জগৎ - তা তো প্রকৃতিরই সৃষ্টি। প্রকৃতিই সমস্ত জীব ও জড়ের লালন ও পালন কর্তৃ। আর আছেন বিশ্বব্যাপী অনন্ত প্রাণ তথা মহাপ্রাণ। যে দেব দেবীকে আমরা পূজা করি তা হল সেই বিশ্বব্যাপী অনন্ত প্রাণেরই এক এক প্রকাশ। এ কারণেই যেকোন বৈদিক পূজার্চনায় "যা দেবী সর্বভূতেষু...” , এই রূপ মন্ত্রে আমরা পূজা শুরু করি। যে দেব দেবীকেই আমরা পূজা করি তিনি এই সর্বভূতে বিরাজমান – এই হয় আমাদের স্তুতি বাক্য। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রাণকে তথা মহাপ্রাণকে 'পুরুষ' বলা হয়েছে। পুরুষ ও প্রকৃতি দুটি পৃথক সত্তা মনে হলেও – এই দুই কখনোই দুটি পৃথক সত্তা নয়। তাই তো শিবের 'অর্ধনারীশ্বর' মূর্তির কল্পনা করা হয়েছে। পুরুষ ও প্রকৃতি, এই দুটি সত্তা পৃথক রূপে অবস্থান করছেন; পুরুষ-প্রকৃতি এই অবস্থান কিন্তু অনাদি কালের  নয়। প্রকৃতির এই অবস্থান পুরুষের প্রয়োজনেই। কার্যের যেমন কারণে লয় হয়, নির্দিষ্ট সময়ের অন্তে (কল্পান্তে) প্রকৃতি পুরুষে লীন হন। পুরুষ তথা পরমাত্মা মায়ার মধ্যে দিয়ে এই প্রকৃতি রচনা করেছেন। তাই পুরুষ ও প্রকৃতি দুটি পৃথক সত্তা নয়। জীবাত্মার ক্ষেত্রে তাই দেখা যায় এক প্রাণ যা সেই অনন্ত প্রাণের এক অপূর্ণ প্রকাশ; মন যা মায়া রূপে সেই প্রাণকে নানা কর্ম বাসনায় লিপ্ত রাখে এবং তনু বা এই স্হূল শরীর যার মাধ্যমে নানা কর্ম সম্পাদিত হয়।
যে জড় জগৎ আমরা দেখি , তাই তা হল পুরুষ তথা প্রাণেরই মায়ারূপ প্রকাশ, যা অনিত্য। কারণের অপসারণে যার লয় অবস্যম্ভাবী। মহাপ্রাণরূপ পরম কারণে তাই মায়ার প্রকাশ রূপ যেকোন সৃষ্টিকেই  লয় পেতে হয় কালের চক্রে।
তাই এ বিশ্ব চরাচরে একটি মাত্র সত্তাই বর্তমান যাকে আমরা নানা রূপে দেখে থাকি। যত দ্বৈত সত্তা আমরা দেখি তা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাপেক্ষে। অজ্ঞান দূর হলে ইন্দ্রিয় আর রজ্জুতে সর্প দর্শণ করে না। সর্বভূতে, সমস্ত জীবে অনন্ত প্রাণ রূপ একই সত্তাকে দর্শণ করে।

মঙ্গলবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

চৈতন্য

চৈতন্য তথা চেতনা কি? বুদ্ধি ও চৈতন্য কি এক? আমরা এর উত্তর অন্বেষণের চেষ্টা করব। বুদ্ধি নির্ণয় করে কি করা উচিৎ এবং কোনটা করা উচিৎ নয়। বুদ্ধি আমাদের যুক্তি কপাটিকার মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত জানায়। অপর পক্ষে চেতনা তথা চৈতন্য আমাদের মনের অনুভূতির সৃষ্টি করে। আমরা অনুভব করতে পারি (we can feel) এবং এটি সতস্ফুর্ত। এর জন্য কোন চিন্তার প্রয়োজন হয় না। চৈতন্য এ ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি বিন্দুতে বর্তমান। অর্থাৎ এই ব্রহ্মাণ্ড চৈতন্যময়। বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটা টান করা রবারের পর্দার উদাহরণ নিতে পারি বা ঢাকের চামড়ার উদাহরণ নিতে পারি। চামড়া বা রবারের পর্দার কোন এক বিন্দুতে একটু টোকা মারলে বা আঁচড় কাটলে পর্দার সমস্ত অংশেই ঐ টোকা বা আঁচড়ের প্রভাব দেখা যায়। এ বিশ্বকে আমরা ঐ টান করা রবারের চাদরের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। এ ব্রহ্মাণ্ডের যেকোন বিন্দুতে সৃষ্ট সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর যেকোন আলোড়নই টান করা চাদরের মতো বিশ্বের প্রতিটি কোনায় তার প্রভাব বিস্তার করে। চেতনা তথা চৈতন্য হল ঐ টান করা চাদর যা বিশ্বব্যাপী অখণ্ডভাবে বিরজমান। আমরা প্রত্যেকেই কম বেশি এই চৈতন্য স্বরূপার এক এক প্রকাশ অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ চেতনা শক্তির অধিকারী। 
ঈশক্রিয়া হল এই টান করা চাদরের উপর এক একটি টোকা যা বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বিস্তার করে। বলা হয়েছে এই বিশ্বের প্রতিটি ঘটনা অপর কোন ঘটনার সাথে কার্য-কারণ সম্পর্কে আবদ্ধ। অর্থাৎ সমস্ত ঘটনাবলী অনেকাংশে পূর্ব নির্ধারিত এবং সমস্ত ঘটনাবলীই অনেকাংশে পূর্বাভাস যোগ্য। এখানে 'অনেকাংশে' বলার কারণ ঈশক্রিয়া। ঈশিক্রিয়াই কোন ঘটনাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। তবে আমরা যাকে ঈশক্রিয়া বলছি অর্থাৎ স্বপ্রনদিত কার্য (কারণ বিহীন)  তাও অপর কোন সূক্ষ্মতর কারণের কার্য। অর্থাৎ সমস্ত ঈশক্রিয়াই হল কোন এক পরম ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। 
তবে এ বিশ্ব অবশ্যই দ্বিমাত্রিক নয়। তাই টান করা চাদরের উদাহরণ কেবল উপমা মাত্র। যে উপমাই আমরা গ্রহণ করি না কেন - বিশ্বের যেকোন প্রান্তে ঘটে যাওয়া সূক্ষ্মতম আলোড়নও বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান এই গুণাতীত সত্তাকেই আমরা স্বয়ং চৈতন্য স্বরূপা বলছি যা তরঙ্গবৎ সর্বব্যাপী বিদ্যমান। চৌম্বক বলরেখা যেমন কোন পদার্থের উপস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয় - যেকোন সামান্য ভরও বিশ্বব্যাপী চৌম্বক আবেশরেখা তথা বলরেখার আকৃতিকে পরিবর্তন করতে পারে - তেমনই চৈতন্য স্বরূপা এই নির্গুণ সত্তাও যেকোন শুভাশুভ কর্মের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রভাবিত হয়। যে প্রাণী যত বেশী এইরূপ চেতনাশক্তির অধিকারী তাকে তত বেশী চেতন যুক্ত আমরা বলে থাকি। আমরা এই চেতনা শক্তিকে বিশ্বব্যাপী তরঙ্গবৎ বিরাজমান বলে গ্রহণ করেছি। এটাই আমাদের স্বিকার্য। এই স্বিকার্যের সাহায্যেই আমরা পরবর্তীতে এই বিশ্বের নানা ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ্য হব। 
অনুসিদ্ধান্তঃ
--> চৌম্বক আবেশ রেখার ন্যায় বিশ্বব্যাপী চৈতন্য যেকোন শুভাশুভ কর্মের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রভানিত হয়। যেমন করে কোন তন্ত্রে (system-এ) ঘটে যাওয়া যেকোন সূক্ষ্মতম শুভাশুভ কর্মও সমগ্র system বা তন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে।
--> তুমি হাসলে আমিও হাসি, তুমি কাঁদলে আমিও দুঃখ পাই, তুমি যখন আনন্দে উচ্ছল হয়ে ওঠো তা আমাকেও নাড়া দেয়। তরঙ্গবৎ চৈতন্যশক্তির অনুনাদই এর কারণ। 
--> ঈশক্রিয়া রূপে এই তরঙ্গের স্রষ্টা স্বয়ং প্রাণ, প্রতিটি প্রাণী তথা চেতনে যার প্রকাশ। 

রবিবার, ৮ মে, ২০১৬

আমি অসহিষ্ণু




আমি অসহিষ্ণু

প্রথমেই প্রতিবাদ জানাই দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা মানবতার ন্যূনতম মূল্যবোধকে কলঙ্কিত করে। পাকিস্তানের পূর্বতন বিদেশ মন্ত্রী খুর্শিদ মাহমুদ কাসুরির লেখা বই "Neither a Hock Nor a Dove” এর মুম্বাই উদ্বোধনে আয়োজক সুধিন্দ্র কুলকার্ণিকে কালি মাখানোর ঘটনা - সবাই যে ছবি দেখেছেন - অটি বড় শত্রুর সাথেও এরকম ব্যবহার কোন সুসভ্যতার লক্ষণ নয়। এরপর গো হত্যা, গো মাংস ভক্ষণ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। প্রতিক্রিয়ায় দেশের নানা বিদ্বজ্জনদের প্রাপ্ত পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান। একশ কুড়ি কোটি মানুষের দেশ ভারতবর্ষে প্রতিটি মানুষ সুখে শান্তিতে স্বধর্ম রক্ষা করে জীবন নির্বাহ করবেন - এটাই কাম্য। হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশ ভারতবর্ষ হলেও আরও নানা ধর্ম এই দেশে লালিত ও পালিত। যে কোন জাতির একটা নির্দিষ্ট অভিলক্ষ্য থাকে। দেশের মানুষের ধর্ম-সংস্কৃতি এই অভিলক্ক্যকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে। "সত্যমেব জয়তে" আমাদের জাতিয় উদ্ধৃতি। সত্যের পথে চলার লক্ষ্যে বহু প্রাচীন আমাদের এই সভ্যতা যেমন আমাদের দিয়েছেন বেদান্ত, ভাগবত, তেমনই সত্যের পথে অবিচল থাকার লক্ষ্যে সত্যের পরীক্ষায় স্থান দিয়েছেন আরও নানা মত ও পথের। চার্বাকের মতো নিরীশ্বরবাদীরাও স্থান পেয়েছে আমাদের এই সভ্যতায়। সত্যের মঙ্গল ঘট পূর্ণ করার লক্ষ্যে 'সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীড়ে' জড়ো হয়েছই আমরা সবাই। সহস্রাব্দ প্রাচীন এই হিন্দু জাতি - বেদান্ত তথা উপনিষদই যাদের ধর্মের মূল ভিত্তি - তাঁদের সামনে এখন ধর্ম রক্ষার লড়াই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের দোদূল্যমানতা - কোনটা সঠিক? ত্যাগ না ভোগ। একদিকে নতুন নতুন সৃষ্টি, আকর্ষণ, নানা হাতছানি - 'আমাকে ওর আগে যেতেই হবে' - 'আমার ওটা পেতেই হবে' - আপর দিকে 'সংগচ্ছদ্ধম সংবদাদ্ধম সংবোমানমসি জানতম' - এক সাথে চলব, এক কথা বলব, একই চিন্তা করব। - ত্যাগেই মুক্তি। কে কি খাবে, কে কি পরবে, কে কি দেখবে - এক কথায় এটা 'ব্যক্তিগত পছন্দ' বলে দিলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। কারণ ব্যক্তির আচরণের উপর তার সামাজিক প্রভাব বর্তমান। সুতরাং তোমার সমস্ত কর্মকান্ডই সমাজে তার প্রভাব ফেলবে। তাহলে? যে মানুষটা গো ভক্ষণ করেছে তাকে মারধোর কর? যে গো হত্যা করেছে তাকেও হত্যা কর?

হ্যাঁ, আমি অসহিষ্ণু। যে দেশ (পাকিস্তান) প্রত্যহ কোন না কোন ভাবে আমাদের সাথে মিথ্যাচনে লিপ্ত, তাদের প্রতি সহ্যের একটা সীমা আছে। কিন্তু কারও গায়ে কালি মাখিয়ে এই অসহিষ্ণুতা! আমি গো হত্যা এবং গো ভক্ষণের বিরোধী। কিন্তু গো হত্যাকারীকে হত্যা করলেই কি আমরা গো মাতার আশীর্বাদ ধন্য হব? মানবতার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে?

হ্যাঁ, হিংস্রতা কোন সমাধান হতে পারে না। জাতীয়তাবাদ যদি উগ্র হয়, তাহলে তা জাতির মঙ্গল সাধন করে না। 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সঙ্ঘ' তার উচ্চ আদর্শ, মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবোধের জন্য গর্বিত। কিন্তু 'হিংস্রতা!' - এ কোন মূল্যবোধের নিদর্শণ। হয়ত বা তারা এই হিংস্রতার সাথে যুক্ত নন। কিন্তু অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে তাঁদের এগিয়ে আসতেই হবে তাঁদের আদর্শ, মূল্যবোধ ও দেশভক্তি নিয়ে। দেশের প্রতি ভালোবাসা যদি তাদের একটুও থাকে। জাতীয়তাবাদ যেন উগ্রতায় পরিণত না হয়। হ্যাঁ, বেদই আমাদের জাতিয় ধারা। আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতির মূল সূত্র। আমরা প্রতিটা ভারতবাসী আমাদের শোণিতে (রক্তে) সহস্র বছর ধরে এই ধারা বহন করে চলেছি। তার সাথে এটাও ভুললে চলবে না যে এদেশে জন সংখ্যার একটা বর অংশ মুসলমান। আর তারা এদেশের বাইরে থেকে ভারতবর্ষে আসেননি। আমাদের কর্মকাণ্ড যেন মানবতার সীমাকে লঙ্ঘন না করে, যে মানবতার শিক্ষা ধর্মই আমাদের দিয়েছেন। নিজের ধর্ম তথা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য উগ্রতার প্রয়োজন হয় না - প্রয়োজন আত্মজ্ঞানের। যে আত্মজ্ঞান আমাদের মুনি ঋষিরা পেয়েছিলেন। আমরা তাঁদেরই উত্তরসূরিরা আজ সেই জ্ঞান বিস্মৃত। বেদের মর্ম বাণী যা সত্যকেই প্রতিধ্বনিত করে - আমরা চেষ্টা করে দেখি না - সত্যের পথে চলা যায় কিনা। আজকে ভারতবর্ষ বিশ্ব সমীক্ষা অনুযায়ী সর্বাধিক ভ্রষ্টাচারী (corrupt) দেশ গুলির মধ্যে অন্যতম। সমস্যার মূল কিন্তু এক যায়গায় - অসহিষ্ণুতা। এই অসহিষ্ণুতাই আমাদের সত্য থেকে দূরে নিয়ে গেছে। সত্যের পথ সুগম নয়। একটু বাধা পেলেই অসত্যের আশ্রয় নেওয়া - এ তো অসহিষ্ণুতারই বীজ। যে বীজ স্বাধীনতার জন্ম লগ্ন থেকে এবং তারও পূর্ববর্তি সময় থেকে আমরা বপন করে এসেছি। আমাদের আনন্দিত হবার কোন কারণ নেই - যে আমি অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সেও এই একই পথের পথিক। তাই একটু চেষ্টা করে দেখি না সত্যের পথে চলা যায় কিনা। অসহিষ্ণুতার ভার আমাদের বহন করতে হবে না। আমরা মুক্ত হব। কাউকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়, যদি না সে নিজে থেকে পরাজয়কে মেনে নেয়। তাই নিজে না চাইলে সত্যের পথ থেকে চ্যুত হওয়াও সম্ভব নয়। আর ভুলই শিক্ষা দেয় ভবিষ্যতে সফল হবার।

মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৬



আমি অসহিষ্ণু


প্রথমেই প্রতিবাদ জানাই দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা মানবতার ন্যূনতম মূল্যবোধকে কলঙ্কিত করে। পাকিস্তানের পূর্বতন বিদেশ মন্ত্রী খুর্শিদ মাহমুদ কাসুরির লেখা বই "Neither a Hock Nor a Dove” এর মুম্বাই উদ্বোধনে আয়োজক সুধিন্দ্র কুলকার্ণিকে কালি মাখানোর ঘটনা - সবাই যে ছবি দেখেছেন - অটি বড় শত্রুর সাথেও এরকম ব্যবহার কোন সুসভ্যতার লক্ষণ নয়। এরপর গো হত্যা, গো মাংস ভক্ষণ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। প্রতিক্রিয়ায় দেশের নানা বিদ্বজ্জনদের প্রাপ্ত পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান। একশ কুড়ি কোটি মানুষের দেশ ভারতবর্ষে প্রতিটি মানুষ সুখে শান্তিতে স্বধর্ম রক্ষা করে জীবন নির্বাহ করবেন - এটাই কাম্য। হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠের দেশ ভারতবর্ষ হলেও আরও নানা ধর্ম এই দেশে লালিত ও পালিত। যে কোন জাতির একটা নির্দিষ্ট অভিলক্ষ্য থাকে। দেশের মানুষের ধর্ম-সংস্কৃতি এই অভিলক্ক্যকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে। "সত্যমেব জয়তে" আমাদের জাতিয় উদ্ধৃতি। সত্যের পথে চলার লক্ষ্যে বহু প্রাচীন আমাদের এই সভ্যতা যেমন আমাদের দিয়েছেন বেদান্ত, ভাগবত, তেমনই সত্যের পথে অবিচল থাকার লক্ষ্যে সত্যের পরীক্ষায় স্থান দিয়েছেন আরও নানা মত ও পথের। চার্বাকের মতো নিরীশ্বরবাদীরাও স্থান পেয়েছে আমাদের এই সভ্যতায়। সত্যের মঙ্গল ঘট পূর্ণ করার লক্ষ্যে 'সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীড়ে' জড়ো হয়েছই আমরা সবাই। সহস্রাব্দ প্রাচীন এই হিন্দু জাতি - বেদান্ত তথা উপনিষদই যাদের ধর্মের মূল ভিত্তি - তাঁদের সামনে এখন ধর্ম রক্ষার লড়াই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের দোদূল্যমানতা - কোনটা সঠিক? ত্যাগ না ভোগ। একদিকে নতুন নতুন সৃষ্টি, আকর্ষণ, নানা হাতছানি - 'আমাকে ওর আগে যেতেই হবে' - 'আমার ওটা পেতেই হবে' - আপর দিকে 'সংগচ্ছদ্ধম সংবদাদ্ধম সংবোমানমসি জানতম' - এক সাথে চলব, এক কথা বলব, একই চিন্তা করব। - ত্যাগেই মুক্তি। কে কি খাবে, কে কি পরবে, কে কি দেখবে - এক কথায় এটা 'ব্যক্তিগত পছন্দ' বলে দিলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। কারণ ব্যক্তির আচরণের উপর তার সামাজিক প্রভাব বর্তমান। সুতরাং তোমার সমস্ত কর্মকান্ডই সমাজে তার প্রভাব ফেলবে। তাহলে? যে মানুষটা গো ভক্ষণ করেছে তাকে মারধোর কর? যে গো হত্যা করেছে তাকেও হত্যা কর?

হ্যাঁ, আমি অসহিষ্ণু। যে দেশ (পাকিস্তান) প্রত্যহ কোন না কোন ভাবে আমাদের সাথে মিথ্যাচনে লিপ্ত, তাদের প্রতি সহ্যের একটা সীমা আছে। কিন্তু কারও গায়ে কালি মাখিয়ে এই অসহিষ্ণুতা! আমি গো হত্যা এবং গো ভক্ষণের বিরোধী। কিন্তু গো হত্যাকারীকে হত্যা করলেই কি আমরা গো মাতার আশীর্বাদ ধন্য হব? মানবতার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে?

হ্যাঁ, হিংস্রতা কোন সমাধান হতে পারে না। জাতীয়তাবাদ যদি উগ্র হয়, তাহলে তা জাতির মঙ্গল সাধন করে না। 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ম সেবক সঙ্ঘ' তার উচ্চ আদর্শ, মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবোধের জন্য গর্বিত। কিন্তু 'হিংস্রতা!' - এ কোন মূল্যবোধের নিদর্শণ। হয়ত বা তারা এই হিংস্রতার সাথে যুক্ত নন। কিন্তু অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে তাঁদের এগিয়ে আসতেই হবে তাঁদের আদর্শ, মূল্যবোধ ও দেশভক্তি নিয়ে। দেশের প্রতি ভালোবাসা যদি তাদের একটুও থাকে। জাতীয়তাবাদ যেন উগ্রতায় পরিণত না হয়। হ্যাঁ, বেদই আমাদের জাতিয় ধারা। আমাদের সভ্যতা সংস্কৃতির মূল সূত্র। আমরা প্রতিটা ভারতবাসী আমাদের শোণিতে (রক্তে) সহস্র বছর ধরে এই ধারা বহন করে চলেছি। তার সাথে এটাও ভুললে চলবে না যে এদেশে জন সংখ্যার একটা বর অংশ মুসলমান। আর তারা এদেশের বাইরে থেকে ভারতবর্ষে আসেননি। আমাদের কর্মকাণ্ড যেন মানবতার সীমাকে লঙ্ঘন না করে, যে মানবতার শিক্ষা ধর্মই আমাদের দিয়েছেন। নিজের ধর্ম তথা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য উগ্রতার প্রয়োজন হয় না - প্রয়োজন আত্মজ্ঞানের। যে আত্মজ্ঞান আমাদের মুনি ঋষিরা পেয়েছিলেন। আমরা তাঁদেরই উত্তরসূরিরা আজ সেই জ্ঞান বিস্মৃত। বেদের মর্ম বাণী যা সত্যকেই প্রতিধ্বনিত করে - আমরা চেষ্টা করে দেখি না - সত্যের পথে চলা যায় কিনা। আজকে ভারতবর্ষ বিশ্ব সমীক্ষা অনুযায়ী সর্বাধিক ভ্রষ্টাচারী (corrupt) দেশ গুলির মধ্যে অন্যতম। সমস্যার মূল কিন্তু এক যায়গায় - অসহিষ্ণুতা। এই অসহিষ্ণুতাই আমাদের সত্য থেকে দূরে নিয়ে গেছে। সত্যের পথ সুগম নয়। একটু বাধা পেলেই অসত্যের আশ্রয় নেওয়া - এ তো অসহিষ্ণুতারই বীজ। যে বীজ স্বাধীনতার জন্ম লগ্ন থেকে এবং তারও পূর্ববর্তি সময় থেকে আমরা বপন করে এসেছি। আমাদের আনন্দিত হবার কোন কারণ নেই - যে আমি অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সেও এই একই পথের পথিক। তাই একটু চেষ্টা করে দেখি না সত্যের পথে চলা যায় কিনা। অসহিষ্ণুতার ভার আমাদের বহন করতে হবে না। আমরা মুক্ত হব। কাউকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়, যদি না সে নিজে থেকে পরাজয়কে মেনে নেয়। তাই নিজে না চাইলে সত্যের পথ থেকে চ্যুত হওয়াও সম্ভব নয়। আর ভুলই শিক্ষা দেয় ভবিষ্যতে সফল হবার।

বুধবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৬

পরা-অপরা


পরা-অপরা



যে জ্ঞান আমাদের বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের পরিচিত করায় - তাই অপরা। আর যে জ্ঞান আমাদের পরম সত্যের দিশা দেয় তা হল পরা বিদ্যা। ভারতীয় শাস্ত্রে আত্মা তথা পরমাত্মাই হলেন পরম সত্য। তাই পরমাত্মাকে জানার জ্ঞানই হল পরা বিদ্যা। অর্থাৎ অধ্যাত্মবাদ তথা অধিবিদ্যাকেই বলা হয় পরা বিদ্যা। পরা অর্থ শ্রেষ্ঠা তথা উচ্চ এবং অপরা অর্থ নিম্ন। অনেক ক্ষেত্রে এই উচ্চ বা পরা বিদ্যাকে শুধু মাত্র বিদ্যা বলেই অভিহিত করা হয়েছে। অপর পক্ষে অবিদ্যা শাস্ত্র হল অপরা বিদ্যা। আমাদের বাস্তব জগতের জ্ঞানকে এই অবিদ্যা বা অপরা বিদ্যা বলে অভিহিত করা হয়। বাস্তব জগতের জ্ঞান যথা পদার্থ বিদ্যা থেকে স্থাপত্য বিদ্যা, কলা, সংগীত - যা কিছু এই মায়াময় জগতে মায়ার বিকাশের সহায়ক সবই এই অপরা বিদ্যা বা অবিদ্যা শাস্ত্রের অন্তর্গত। প্রাচীন ভারতবর্ষে বিদ্যা তথা পরা বিদ্যার সাথে সাথে অপরা বিদ্যা তথা অবিদ্যা শাস্ত্রও বিকশিত হয়েছিল। দিল্লীর কুতুবশাহি কমপ্লেক্সে রক্ষিত গুপ্তযুগের মরিচা বিহীন লোহার স্তম্ভ, প্রাচীন সোমনাথ মন্দিরের ঝুলন্ত বিগ্রহ( যা সবুক্তগিন ধ্বংস করেছিলেন) - সবই প্রাচীন ভারতে অপরা বিদ্যার অভূতপূর্ব নিদর্শনের সাক্ষী। আমাদের উপনিষদে পরা বিদ্যাকে যেমন পরম জ্ঞান লাভের উপায় রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে তেমনই অপরা বিদ্যাকে জাগতিক উন্নতি তথা বিকাশের সহায়ক রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। জগতের বিকাশের জন্য উভয় বিদ্যাই সমান ভাবে প্রয়োজনীয়। তাই আমাদের মাণ্ডুক্য উপনিষদে বলা হয়েছে "দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে পরা চাপরা "